নেপথ্যের সাতকাহন : ওয়ার ক্রাইমস ফাইলস

 

Ahmedসত্য বয়ান থাকবে কাজটিতে। থাকতে হবে আমাদের ৭১ এর স্বাধীনতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী তিন রাজাকার আল বদরের মুখ-মুখোশ উন্মোচনের সত্যানুসন্ধান। প্রতিকূল পরিস্থিতি, সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করতে হবে, ফসল তুলে আনতে হবে। তাই সুটিং-এ নানান সময়ে মিথ্যে বলতে হয়েছে , বলতে হয়েছে রাস্তাঘাট উন্নয়নের বিদেশী বরাদ্ধ আসবে তার জন্যে ছবি নেয়া হচ্ছে। জামাত শিবিরের মারমুখি মিছিলের ছবি নেয়া হয়েছে, বিবিসিতে প্রচার হবে এই বলে। মহিলা সমিতি থেকে এক কদম দূরে মেকাপম্যান ফারুক ভাইকে বলে কয়ে চোখ বেধে ব্যারিস্টার ড. কামাল হোসেনের বাসায় যেখানে আমাদের ফিল্ম ইউনিটের ক্যাম্প ছিলো সেখানে নিয়ে গিয়ে চৌধুরী মাইনউদ্দিন এর চরিত্রের জন্যে গবেষক জুলফিকার আলী মানিক-কে মেকাপ করতে হয়েছে।
“কোন ক্যামেরা নেই”, “কোনকিছু রেকর্ড হচ্ছে না ” বলে ছোট হ্যান্ডব্যাগে লুকানো ক্যামেরা দিয়ে সাক্ষাৎকার ধারন করেছি আমরা সিলেটে।
কত শত মিথ্যা যে সেই মাসটিতে বলেছি তার ইয়েত্তা নেই। কাজটি অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে করতে হয়েছে বলেই মিথ্যার আশ্রয়। কাজটির জন্যে অনুমতি ছিল না সরকারের। মাথার উপর তখন কোটি কোটি টাকার জামাতী মালিকেরা, ক্ষমতাধর জামাত শিবির।

ধরা পরে গেলে জেল জরিমানা হতে পারতো। হতে পারত প্রাণনাশ।

বলছি ডিচপ্যাচেস -”ওয়ার ক্রাইমস ফাইলস” এর কথা -

১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের চ্যানেল ফোর এর জন্যে টুয়েন্টি টুয়েন্টি কোম্পানি এই প্রামাণ্যচিত্রটি প্রযোজনা করে। মূল বিষয় ছিল ব্রিটেনে অবস্থানরত তিন নরঘাতক রাজাকার চৌধুরী মঈনুদ্দীন, লুৎফর রহমান ও আবু সায়ীদ এর ৭১ সালে হীন কর্মকান্ডের দায়ে অভিযুক্ত করা যাতে অন্তত ব্রিটেনে গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধে এদের অভিযুক্ত করা যায়, বিচার করা যায়, দন্ড দেয়া যায়।

জীবনের কিছু কাজ নিয়ে নিজের গর্ব লাগে, যা একান্ত মনের, চেতনার, বিশ্বাসের অনেক কাছাকাছি। যাতে থাকতে পেরে নিজেকে একটি ভাল কাজের সাথে অসম্পৃক্ত হতে পেরেছি ভেবে আজও ভাল লাগে। তেমন একটি কাজ ” ওয়ার ক্রাইমস ফাইল “। ছিলাম তাতে বাংলাদেশের অংশের প্রডাকশন ম্যানেজার। অনেকটা টোটাল ম্যানেজমেন্ট এর দায়িত্বে ছিলাম। বাংলা ভার্সন এ বিভিন্ন অংশে কণ্ঠও দিয়েছি।

যেভাবে জড়ালাম:

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের আন্তজাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব এর মাধ্যমে রঞ্জন, রুচির জোসী, গীতা সায়গল প্রমুখদের সাথে পরিচয় ছিল।

গীতার প্রপোজাল, ডেভিট বার্গম্যানের মুখ্য গবেষনা শেষে কাগজপত্র পরিকল্পনা করে কাজে নামে চ্যানেল ফোর এর পক্ষে টুয়েন্টি টুয়েন্টি কোম্পানি। সুটিং এর সকল ব্যবস্থাপনার জন্যে তাদের দরকার বিশ্বস্ত সমমনা একজন লোকের। চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, রঞ্জন পালিত, মিশুক মুনীর এর সুপারিশে পরিচালক হাওয়ার্ড ব্রেডবার্ন, নির্বাহী প্রযোজক গীতা সায়গল, ডেভিড বার্গম্যান ইন্টারভিউ নেয়। তাদের পছন্দ হয় আর কাজে নেমে যাই সেদিনই অত্যন্ত গোপনে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ মাঠ পর্যায়ের গবেষনায় ছিলেন নির্ভীক গবেষক দল। ছিলেন শামীম আখতার, অধীর চন্দ্র দে, মেহেদী হাসান, শাহজাহান কাওসার, জুলফিকার আলি মানিক, তাজুল মোহাম্মদ, তানভীর মোকাম্মেল, অনল রায়হান, তৌহিদ রেজা নূর, ফরিদা শাহনাজ।

Rajakar

একাত্তরের ঘাতক রাজাকার আলবদর। ছবি : মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ

রহমত যখন রঞ্জন পালিত:

বাংলাদেশের অংশের সুটিং এর জন্যে পুনের ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট এর স্নাতক কলকাতার ছেলে রঞ্জন পালিতকে প্রধান ক্যামেরাম্যান নেয়া হয়। ৯০ ভাগ এর সুটিং রঞ্জনকে করতে হয়েছে। আর কিছু কাজ মিশুক মুনীরকে করতে হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটি যেহেতু অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে করা হয়েছে। হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে অনেক জায়গায় শুটিং করতে হয়েছে আমাদের তখন। কখন কি হয়। সব কাজ এমনভাবে করা হয়েছিলো যেন সংশ্লিষ্ট গবেষক আর প্রামাণ্য চিত্রের টিম ছাড়া আর কেউ জানতে পারে।

রঞ্জন সংগত কারনে ছদ্ধনাম নিতে চাইলে ” রহমত ” নামে ডাক দেই। সে সাড়া দেয়। এই নামটি অত্যন্ত সচেতন ভাবে ডাকতে হতো। নি
শুক্রবার নামাজের দিনে বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভিতর-বাহির সুটিং করতে এই নামেই ডাকি তাকে। কাজের প্রতি এমন শতভাগ শ্রদ্ধাশীল, অকুতোভয় এই মানুষটির প্রতিকূল পরিস্থিতি কি করে কাজ করে যেতে হয় তা দেখিয়েছে এই প্রামান্যচিত্রে।

লোকেশন ফেনী :

৯৫ এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ফেনীর সুটিং ছিলো। ভিপি জয়নাল আবেদিন এর সাক্ষাৎকার ধারন করা হয়। পরে ফাজিলের হাট। রাজাকার চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এর বাড়ী। যেখানে এক চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হই আমরা। স্থানীয় যুবকরা আমাদের ঘেরাও করে ফেলে। সাদা মানুষ দেখে তাদের কৌতূহল বেড়ে যায়। চিন্তার ফাঁকে চোখে পড়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার স্মৃতি পাঠাগার। তখন দ্রুত মিথ্যের জাল বুনি। বলি এরা ব্রিটেন থেকে এসেছে শহীদুল্লা কায়সার, জহির রায়হান এর স্মৃতি উদ্দেশ্য কিছু করা যায় কিনা সেটা সরজমিনে দেখার জন্যে। পরিচালক হাওয়ার্ড, ডেভিট, সাউন্ড রিকোডিষ্ট টিম এর তখন অস্থিরতা। কি হয় কি হয় সদা ভয়। এনজিওর কথা বলাতে কাজ হয়। যুবকরা উৎসাহ নিয়ে ফরেনারদের সাথে কথা বলতে আসে। শিক্ষিত কয়েকজন যুবক শহীদুল্লা কায়সার সম্পর্কে জানাতে লাগলো।কিন্তু আমার মাথায় তখন অন্য চিন্তা খেলা করছে। চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের বাড়িতে কিভাবে যাওয়া যায়, তাইই চিন্তা করছিলাম। সরাসরি কিছু বলতে পারছিলাম না। যুবকদের প্রশ্ন করলাম, আর কে এখানে বিখ্যাত আছেন? তারা আবারো জহির রায়হান, শমী কায়সার এর নাম বললো। এক পর্যায়ে নেতাটাইপের একজন কাংখিত উত্তর দেয়, আরেকজন আছে তবে বিখ্যাত না কুখ্যাত। আমাদের গ্রামের কলঙ্ক। তার জন্যে আমাদের অনেক লজ্জা। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন, বড় রাজাকার ছিল। ক্লু পেয়ে গেলাম। বাড়ীটা কোথায় বলতে আংগুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল খুবই কাছে। আরোও জানলাম তার ভিটেতে কেউ নেই। রঞ্জন রহমত নামে বাড়ীতে গেল , ক্যামেরাবন্দি হলো বাড়ীর আংগিনা, পুকুর, গাছ-গাছালি। খুশি হয়ে খেলাধুলার সরঞ্জামাদি কেনার জন্যে কিছু যুবকদের কিছু অর্থ অনুদান দেয়া হলো প্রডাকশনের পক্ষ থেকে। আমরা নিয়ে এলাম চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এর ঘরের ছায়া।

সিলেট শুটিং:

সিলেট শহর, বিয়ানীবাজার, কানাইর ঘাট শুটিং ছিলো রীতিমত ভয়াবহ। একদিন বিয়ানী বাজারের এক দূর্গম এলাকায় নেয়া এক রাজাকারের সাক্ষাৎকার। তখন রাত বাজে প্রায় ১০টা। পুরো এলাকা ছিল জামায়াত – শিবিরের কর্মী ভর্তি । চারিদিকে কানাঘুষা চলছে। রাজাকারকে আমরা আশ্বস্ত করলাম এই বলে তার সাক্ষাৎকার কোন পত্রিকায় ছাপা হবে না। তিনি রাজি হলেন, আমার হাতে ছিল ছোট একটা ব্যাগ। এই ব্যাগের মধ্যে ক্যামেরার লেন্স বসানো।এতো ছোট যে বোঝার কেনো উপায় নেই। সার্ট, প্যান্ট এর ভিতর দিয়ে তার চলে যায় মাইক্রোবাসে থাকা ক্যামেরায়। রেকর্ড হতে থাকে একাত্তরে তাদের নিষ্ঠুরতা, বর্বরতার প্রামাণ্যচিত্র। ভয় আর উত্তেজনা দুটোই ছিল সেই সময়টাতে।

সিলেট শহরে একদিন মারমুখি এক মিছিলের ছবি তুলেছে রঞ্জন। শিবিরকর্মীরা কোনভাবে জানতে পারলে রাস্তায়ই আমাদের জবাই করতো সেদিন। মিছিলে অনেকের কাছেই অস্ত্র, রামদা লুকানো দেখেছি তখন। দ্রুত অনুমতি নিয়েছিলাম কেন ছবি তুলছি তার মিথ্যে ব্যাখা দিয়ে।

ঢাকার শুটিং:

সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনের স্ত্রীর, মোফফাজল হায়দার চৌধুরীর স্ত্রীর সাক্ষাৎকার ছিলো আগে-পিছে আবেগময়, বেদনার, কষ্টের । মেঘনা গুহ ঠাকুরতা যখন তার পিতার হত্যার বর্ননা করে পুরো ইউনিট তখন স্তম্ভিত হয়।

সাংবাদিক এনায়েতউল্লাহ খান যখন রায়ের বাজার বধ্যভূমি গিয়ে তার বর্ননায় দেয় তখন আমাদের অদেখা লাশগুলি চোখের সামনে যেন ভেসে উঠে। অত্যন্ত স্পষ্ট ঋজু ভঙ্গীমায় বলে জান তিনি, পরে নিউজ ফুটেজ দেখেছি একাত্তরে এভাবেই বলেছিলেন তিনি।

রি-কন্সট্রাকশন

এটা ছিলো বিশাল চ্যালেঞ্জ। বলা যাবে কিনা হচ্ছে। অভিনেতা লাগবে কিন্তু বাইরের কাউকে নেয়া যাবে না। নিজেদের মধ্যে থেকেই করতে হবে। অতএব অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ কে অভিনয় করতে হয় মোফফাজল হায়দার চৌধুরী চরিত্রে, অনল রায়হান ( জহীর রায়হান, সুমিতা দেবীর ছেলে) ; অধীর ( মধুদার ছেলে) ; মেহেদী ( মিনার মাহমুদের ছোট ভাই) প্রমুখকে করতে হয় পাকসেনা চরিত্রে অভিনয়। চৌধুরী মাঈনুদ্দিন চরিত্রে অসম্ভব সফল অভিনয় করেছে জুলফিকার আলি মানিক। আমাদের ইউনিট এর পাচক -পাচিকাদেরও বুঝিয়ে শুঝিয়ে অভিনয় করেয়েছি। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা।

ব্রিটেনে ফুটেজ পাঠানো:

আমাদের সার্বক্ষণিক বাহনের বিশ্বস্ত চালককে হাসান ভাইকে নিয়ে একাই চলে যাই মতিঝিলের কুরিয়ার সার্ভিস ডিএইচ এল এর অফিসে টেপগুলি ব্রিটেনে পাঠানোর জন্যে। প্রথম দিনের সুটিংর মান যাচাই এর উদ্দেশ্য। হাই এইট এর টেপগুলি অনেকটা তখনকার মূলত গানের ক্যাসেট এর মতো দেখতে। আগের রাতে গানের কাভার ঠিক রেখে ভেতরে টেপ বদলে লন্ডনে জরুরী কুরিয়ার করতে চাইলে আইনের মারপ্যাচে পাঠাতে না পেরে ফেরত আসতে হয় আমাকে। পরে ড. কামাল হোসেন বলে দিলে গুলশানের শাখা থেকে প্রথম কিস্তির টেপ পাঠাতে সক্ষম হই। আমাদের কাজ ফলবান হবে সেই আশা রচিত হয়। রচিত হয় অন্য ইতিহাস।

বাংলা ভার্সন

প্রায় বছরখানেক পর আবারো গোপনভাবে গ্রীন রোডে সুরকার আজাদ রহমানের স্টুডিওতে বাংলা ভার্সন রেকর্ড করা হয়। আসাদুজ্জামান নূরের ধারা বর্ননায়, আলী যাকের, তৌহিদ রেজা নূর, তন্ময়, অনলসহ আমরা অনেকে কন্ঠ দেই। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চুপ করে ঢুকে যেতাম স্টুডিওতে। আবার অনেক রাতে চুপিচুপি একেক করে বেরিয়ে আসতাম।

প্রামাণ্যচিত্রটি ইংল্যান্ড এর চ্যানেল ফোর এ, মে মাসের ৩, ১৯৯৫ সালে প্রচার করে। আর বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম প্রচার হয় ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর।

বয়স থাকলে মুক্তিযুদ্ধে যেতাম। রিকয়েলেস রাইফেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরতাম পাকসেনার বিরুদ্ধে।
না যেতে পারার এই সংগত কারন মেনে নেয়ার অভিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করতে পেরেছি তাতেই আমি আনন্দিত, আপ্লুত, গর্বিত। জয় বাংলা!

আহমেদ হোসেন
টরন্টো

মন্তব্য