রোহিঙ্গা ইতিহাস: বাংলাদেশ, বার্মা ও আরাকান প্রেক্ষাপট 

Mahbub Chowdhury

মাহবুবুর রব চৌধুরী

ইতিহাসের স্বাধীন আরাকান, রাখাইন নামে এখন মিয়ানমারের সাতটি এস্টেটের একটি। মিয়ানমারের পূর্ব নাম বার্মা । সরকার স্বীকৃত ১৩৫ টি ভাষাভাষী এথনিক জনগোষ্ঠির মাঝে মূল বার্মার -বামার ভাষীরাই সব থেকে বড় অংশ। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটের উৎস এবং নিস্পত্তির সূত্র খুঁজে পেতে, আরাকান ও বার্মার অতীত জানতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস না জেনে , শুধু মাত্র খণ্ডিত চিত্র দেখে সমাধানের প্রচেষ্টা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবেনা এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে পাওয়াটাও খুব একটা সহজ হবেনা।
আরাকান ও বার্মার দীর্ঘ ইতিহাস দ্বন্দ্বে ভরা। মূলত বার্মার আগ্রাসী দখলদারি কাহিনীতে পরিপূর্ন ।
২০১৭ সালের অগাস্ট এর শেষ ভাগে মিয়ানমার নুতন করে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের অসহায় অবস্থায় নিজ জন্ম ভূমি থেকে জোর করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। তাই বিষয়টি বিশ্ব ফোরাম ও গণ মাধ্যমে আবারও এসেছে। মগের মুল্লুক কথাটি এখনোও যে বার্মার জন্য প্রযোজ্য তা এবারও দেখাল বার্মা। অং সান সুচির তথা কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের – সামরিক , আধা সামরিক ,নাসাকা এবং সশস্ত্র বৌদ্ধ জঙ্গিদের পরিকল্পিত হামলার মুখে নিরুপায় হয়ে জীবন, মান, সন্মান, ইজ্জত বাঁচাতেই রোহিঙ্গারা স্থাবর, অস্থাবর সব কিছু ফেলে বাংলাদেশ আসতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গা নির্মূল পরিকল্পনায় বা এথনিক ক্লিনজিং এ, গণহত্যা, পাশবিক নির্যাতন, অগ্নি সংযোগসহ সব ধরণের বর্বরতার পথ মগ বার্মিজরা নিয়েছে। এটি বর্বরতার ইতিহাসে নুতন সংযোজন। মগের মুল্লুক কথাটি বর্বরতা নিষ্ঠূরতা, নিয়ম নীতি হীন অরাজকতা কেই বুঝায়।
বার্মা এবং আরাকানে কিছু কথা -কিছু শব্দ প্রচলিত আছে কিভাবে কোন প্রেক্ষাপটে এগুলি এল তা জানার আগ্রহ সবার আছে। যেমন মগ, রোহিঙ্গা, আরাকান , আকিয়াব ইত্যাদি। উত্তর খুঁজলে যা পাওয়া যায় তা হল, অনেকেরই ধারণা ভারতের মগধ থেকে আসা বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারকদের কারণে মগ শব্দটি এসেছে। যারা নব দীক্ষা পেয়েছে মূল বার্মার সেই বর্মীদেরকেই লোকে মগ বলে। আররুকন থেকে আরাকানের উৎপত্তি। রুকন অর্থ পিলার – স্তম্ভ। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ, আররুকন। আকিয়াব, একটি নদীর পাড়ে, এক জলের ধারে। যেমন PUNJAB (পাঞ্জাব)- পাঁচ নদীর পাড়ে, তেমনি অকঅই- আকিয়াব। রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তির আছে আরো চমৎকার এক কাহিনী। অনেক অনেক দিন আগে আরাকান উপকূলে এক আরব জাহাজ ডুবির পর সবাই অলৌকিক ভাবে জীবন বাঁচিয়ে তীরে উঠে আসেন, কিভাবে তারা বাঁচলেন ? এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই বলেছিল আল্লার রহমতে, এই রহমত থেকেই তারা রোহিঙ্গা হিসাবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে আর যারা এই ক্যাটাগরিতে রোহিঙ্গা হিসাবে যোগ হয় -তারা প্রধানত ১৪৩০ সনে নরমিখলার আমলে, বাংলাদেশ, আসাম, অঞ্চল থেকে যাওয়া মূলত মুসলিম কৃষক পরিবার। নরমিখলা বাংলার সুলতানের ৩০ হাজার মুসলিম সেনা সহযোগিতায় ২৪ বছর পর মগ দের দখল থেকে আরাকানের স্বাধীনতা উদ্ধার করেন ।

Rohinga 2রোহিঙ্গারা আরাকানের মাটিতে রহমতের জোয়ার এনেছে, শত, শত বছরের বিরান অনাবাদি পতিত জমিতে সোনার ধান ফলিয়ে একদিকে খাদ্য অভাব পূরণ করেছে অন্য দিকে মৎসজীবিদের থেকে দ্বিগুন খাজনা দিয়ে রাজকোষ ভরে তুলেছে। উৎপাদনশীল এই কর্মকান্ড রাজা, প্রজা, সকলের কাছেই দারুন ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের সন্মান ও মর্যাদা সুনাগরিক হিসাবে স্বাধীন আরাকানের মারাউকি আমলের ৩৫৫ বছর দিন দিন বেড়েছে। আরাকান বাংলাভাষী দেশ না হলেও মেজরিটি রোহিঙ্গার ভাষা বাঙলা হওয়ার কারণেই, রাজসভায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। উৎপাদনশীল, সুনাগরিক রোহিঙ্গারা ছিলেন-, মগদের সামাজিক, কৃষ্টিক, রাজনৈতিক এবং হামলা – আক্রমণ প্রতিরোধের শক্ত প্রতিরোধ। রোহিঙ্গারা মূলত মুসলিম হবার কারণে বাংলার সুলতান ও মোগল ভারতের নজরে ছিলেন। এটা মগদের বিরুদ্ধে কাউন্টার ব্যালান্স রাখতে সাহায্য করত । দ্বিতীয়ত রোহিঙ্গারা নিয়মিত খাজনা দিয়ে প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী সচল রাখতে বিরাট ভূমিকা রাখতেন। আরাকান এবং বার্মা ইতিহাস, বাংলার সুলতান ও মোগল ভারতের ইতিহাসের মাঝে রোহিঙ্গা ইতিহাসের বীজ লুকিয়ে আছে। সম্ভবত সিনো, মঙ্গোলয়েড নামের উচ্চারণিক ভঙ্গির কঠিনতার কারণে এবং কিছুটা কষ্টসাধ্য, কিছুটা অপরিচিত আর অপ্রচলিত হবার কারণেই রোহিঙ্গাদের নিয়ে ইতিহাস চর্চা ততটা হয়নি। একই কারণে হয়ত বার্মা আরাকানি ইতিহাস আমাদের নিকট খুব একটা পরিচিত এবং আলোচিত বিষয় নয়। আমাদের নিজস্ব ইতিহাসের মজবুত গাঁথুনি নির্মাণে এই ইতিহাস চর্চা জরুরি। এটা আমাদের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন।
বার্মা ইতিহাস : (History: of Burma.)
(১.) প্রাচীন কাল
(২) নগর রাজ্য কাল
(৩) প্রথম প্যাগান কাল।
(৪) প্যাগান ডাইনেস্টি কাল। (প্যাগান আমল।): Pagan empire: The first king of Pagan- king anawratha- The last king of pagan, king Narathihapate -রাজা আনারাথা থেকে রাজা নারাথিপাঠে পর্যন্ত -১০৪৪- ১২৮৭, শাসন কাল প্রায় ২৫৩ বছর। (ডিসেম্বর ১২৭১ , চীনে কুবলাই খান ইউয়ান মঙ্গোল ডাইনেস্টি ( Yuan Dynasty ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১২৭৭ এ তিনি বার্মা আক্রমণ করেন। মঙ্গোল আক্রমণ এর পর বার্মায় প্যাগান ডাইনেস্টির পতন শুরু এবং অনেক গুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যর উত্থান।)
( ৫) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য কাল । Small Kindoms -১২৮৭ -১৫১০. – সময়কাল ২২৩ বছর। প্যাগান সাম্রাজ্য পতনের পর অনেক গুলি ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব হয় তার মাঝে আভা , পেগু , সান এই তিনটি রাজ্য ছিল উল্লেখ যোগ্য।
ক।- আভা রাজ্য। ( ১৩৬৪ -১৫৫৫ )
খ।- পেগু রাজ্য /( হানথাদি ডয়নেস্টি- ১২৮৭ – ১৫৫২) -
গ। – সান রাজ্য। ( ১২৮৭ – ১৫৬৩ )-
(৬) টংগু রাজত্ব কাল। –: Toungoo Empire-১৫১০-১৭৫২ – টংগু শাসন কাল -রাজা মিনজি নেয় থেকে রাজা মহা ধাম্মা রাজা পর্যন্ত ১৫১০ থেকে ১৭৫২ পর্যন্ত – শাসন কাল প্রায় ২৪২ বছর
(৭) কনবাউঙ আমল Konbaung empire. – কনবাউঙ শাসন কাল -রাজা আলাউ পায়া থেকে রাজা থি বিন মিন পর্যন্ত ১৭৫২ – ১৮৮৫ – শাসন কাল প্রায় ১৩৩ বছর ।
(৮) ব্রিটিশ রুল -ইংরেজ শাসন : ইংরেজ শাসন মূল বার্মা – ১৮৮৫ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত। প্রায় ৬৪ বছর. লোয়ার অংশ আরাকান ১৮২৬ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত। ১২২ বছর।
(৯) বর্তমান মিয়ানমার :- ১৯৪৮ , ইংরেজ শাসন অবসান এর পর স্বাধীন বার্মা / মিয়ানমার আমল । ।
আর্কিওলজিক্যাল নিদর্শনের ভিত্তিতে বার্মা ও আরাকানে জনবসতির ইতিহাস অনেক পুরান। ইতিহাসে এ দুটি দেশের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক চিত্র হল বার্মা- দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে, বে অফ বেঙ্গল (Bay of Bengal) এর পাড়ে বাংলাদেশ ,ভারত ,চীন ,লাওস ,এবং থাইল্যান্ড দিয়ে ঘেরা একটি দেশ। আরাকান পর্বতমালা প্রাকৃতিক ভাবে বার্মা ও আরাকান কে দুটি পৃথক ভূখণ্ডে ভাগ করেছে, Burma covers 653,508 square kilometers of land and 23,070 square kilometers of water, making it the 40th largest nation in the world with a total area of 676,578 square kilometers. বার্মা এবং আরাকানের এথনিক জনগোষ্ঠির ভাষা, ধর্ম এবং নৃতাত্ত্বিক বৌশিষ্টের মূল দিক গুলি ভিন্ন। ( বার্মার মূল অংশ আপার বার্মা তে প্রায় ১৪০ টি এথনিক জাতিগোষ্ঠি আছে।) সংখ্যার দিক থেকে ওরা এইরূপ।। বামার বা বার্মান -৬৮%, – সান – ৮ %, -করেন – ৬%, -রাখেন – ৩%, – মন – ৩%, -চীন – ৩%, – রোহিঙ্গা ২% ,- কায়া – ১%, -কাইন- ১% – অন্যান্য – ৫%.,-। আপার বা মূল বার্মায় ৯০% থেরাভাদা বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী। আর আরাকানের বৌদ্ধরা মাহিয়ানা সেক্টস এর অনুসারী। বার্মার জন সংখ্যা ৫৬,৮৯০,৪১৮ জন । থেরাভাদা বৌদ্ধ ও মাহিয়ানা বৌদ্ধ সেক্টস এর পার্থক্য:-থেরাভাদা ( Theravada Sects : The teaching of the elders) বৌদ্ধ রা বিশ্বাস করে , জীবন চক্র -Nirvana মহামুক্তি পারফেক্ট না হওয়া পর্যন্ত মিলবেনা। অপর দিকে আরাকানের মাহিয়ানা সেক্টস এর অনুসারী বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে , জীবন চক্র -The great vehicle, মহা মুক্তি Nirvana উন্নত জীবন অর্জন করলেই পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ থেরাভাদা (Theravada Sects : The teaching of the elders, পারফেক্ট লাইফ এবং Mahayana -(The great vehicle,) Better life - অনুসন্ধানী ।
আরাকান দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি ছোট কোস্টাল দেশ। আয়তন ১৪ হাজার ২ শত বর্গ মাইল। ২০১৪ সনের আদম শুমারি  অনুসারে জন সংখ্যা ৩১৮৮৮০৭, রাখাইন ,রোহিঙ্গা ,মারমা ,মোরো , করেন , কামান ,কামিন , খামি, সান মন নৃ জাতি গুষ্টির বসবাস। লম্বায় ৪০০ মাইল এবং সাগর থেকে শেষ সীমানায় বড় এবং ছোট অংশ ৯০ই থেকে ৪৫ মাইল। বাংলাদেশের সাথে আছে ২০৮ মাইল স্থল আর ৬৩ মাইল জল সীমানা। আরাকানের মংদু শহর বাংলাদেশ থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। কোন এক সময় বাংলাদেশ এই রাস্তা টুকু নিজ খরচে করতে চেয়ে ছিল। বাংলাদেশ বর্মা ফ্রেন্ড শিপ রোড নাম দিয়ে। পূর্ব থেকে পূর্বে ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট এ মিশে যাওয়ার এটি বাংলাদেশের অংশ। বাংলাদেশ ,বার্মা , চীন। ভারত ,থাইল্যান্ড সহ অনন্যা পূর্ব এশিয়ার দেশ সমূহের মিলিত শত বিলিয়ন ডলারের বাৎসরিক ব্যাবসার ডায়মন্ড রোড।
বর্তমান রোহিঙ্গা সংকট – যা ঢেকে ফেলেছে, সংকট সৃষ্টির জন্য এই সময়টা বেছে নেওয়াটা শত ভাগ উদ্দেশ্যে মূলক। গভীর ষড়যন্ত্র । রোহিঙ্গাদের এই ভাবে বিতাড়িত করা। দীর্ঘ দিনের প্রক্রিয়ার ফল । সেপ্টেম্বর ২০১৭ এর তালিকা অনুযায়ী বিতাড়িত রিফুজি রোহিঙ্গা রা – বাংলাদেশে ৮৯০,০০০ জন, পাকিস্তানে ৩৫০,০০০ জন, সৌদি আরবে ২০০,০০০. জন, মালয়এশিয়াতে ১৫০,০০০ জন, ভারতে ৪০,০০০ জন, আরব আমিরাতে ১০,০০০ জন, থাই ল্যান্ডে ৫,০০০ জন ,ইন্দোনেশিয়াতে ১,০০০ জন, ইউরোপ , আমেরিকা , অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য দেশে ৪,০০০ জন। এই ভাবে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে আছে – দেশ ছাড়া ঠিকানা বিহীন রোহিঙ্গা জনসংখ্য ।
প্রাচীন ধানী ওয়াদি শাসন আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আরাকানের আছে অনেক পুরান সমৃদ্ধ ইতিহাস। সুদূর অতীতে -আরাকান ছিল একটি সুন্দর পর্যটন দেশ। উপযুক্ত ভাবে গড়ে তুললে তার গৌরব ময় অতীত ফিরিয়ে আনা এখনও সম্ভব। আরাকান হতে পারে ঘরের পাশের নুতন হং কং। এখন ধানি ওয়াদি আরাকান থেকে মগ বার্মা অধীন রাখাইন পর্যন্ত পথ চলার সংক্ষেপ ইতিহাসটা দেখা যাক।

(১) প্রাগ ঐতিহাসিক আমল।
(২ ) ধানি ওয়াদি আমল । খ্রিস্ট পূর্ব (৬০০ থেকে – ৩০০ ) খ্রিস্টাব্দ। (৩ ) ভেসালি বা ওয়াথালী আমল। ৩০০ – ৮৯৪,পর্যন্ত।
( ৪ ) এর পর তিন পর্বে লেমরু আমল – ৫১২ বছর। ৮৯৪- ১৪০৬ .
( ক) : প্রথম লেমরু স্বাধীন আমল।
(খ) দ্বিতীয় লেমরু আমল : আধা -পরাধীন লেমরু – ১০৪৪-১২৮৭ পর্যন্ত। ১০৪৪ সালে প্যাগান রাজা আনারাথার আরাকান আক্রমণ এবং খাজনা নেবার শর্ত শুরু।
(গ) : তৃতীয় লেমরু আমল। – ১২৫৫- ১৪০৬ , পর্যন্ত। লেমরু শাসনের শেষ বা তৃতীয় পর্বের শেষ রাজা ছিলেন মিন স মন। তার আরো দুটি নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। নরমিখলা এবং সব শেষে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এর পর নাম নেন সুলতান মোহাম্মদ সোলায়মান শাহ।
( ৫ ) পরাধীন আমল : আভা মগের দখলে ২৪ বছর। ১৪০৬ – ১৪৩০ সাল পর্যন্ত। বার্মার, আভা রাজা মিন খং ১৪০৬ সালে , লেমরু শাসনের শেষ রাজা – মিন স মন বা নরমিখলা কে পরাজিত করে আরাকান দখল করে নেন। এই দখল ২৪ বছর স্থায়ী হয়।
এই সময় রাজা নরমিখলা বাংলাদেশ পালিয়ে যান। এবং বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর দরবারে রাজ্ নৌতিক আশ্রয় নেন। আজম শাহ – রাজা নরমিখলাকে আরাকান স্বাধীনতা উদ্ধারে সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তবে তিনি মারা গেলে , সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহ বাংলার ৩০ হাজার সেনা বাহিনী পাঠান আরাকানের স্বাধীনতা উদ্ধারে। ( সুলতান মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শাহ ছিলেন রাজা গণেশের পুত্র। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নুতন নামে বাংলা শাসন করেন।
(৬) স্বাধীন আরাকান মারাউকি আমল. — ১৪৩০- ১৭৮৫ পর্যন্ত। স্বাধীন মারাউকি আমলের ৩৫৫ বছর।
(৭) পরাধীন মগ আমল-: ১৭৮৫ থেকে ১৮২৬- পর্যন্ত – ৪২ বছর আরাকানের অন্ধকার যুগ।
( ৮ ) ব্রিটিশ রুল – ১৮২৬ – ১৯৪৮ পর্যন্ত।
( ৯ ) বর্তমান মগ বার্মা শাসন আমল : ১৯৪৮ – ২০১৭ , ( বার্মা বর্তমান মায়ানমার শাসন।)
আরাকানের আদি মানুষ ইন্দো – মঙ্গোলয়েড। মারাউকি ডাইনেস্টির প্রতিষ্ঠাতা রাজা নরমিখলা ছিলেন একজন বহু বিধ প্রতিভার অধিকারী রাষ্ট্র নায়ক। তিনি আরাকানের লেমরু ডাইনেস্টির শেষ রাজা এবং মারাউকি ডাইনেস্টির প্রতিষ্ঠাতা। আরাকানের তিনটি ধারার প্রতিভূ। তিনি ভারতীয় ,মঙ্গলয়েড এবং মুসলিম ঐতিহ্যর সমন্বয়ে আরাকানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন।

নরমিখলা তার ভারতীয় নাম প্রাচীন ভারতীয় পরিচয় ধারণ করে। মিন স মন মঙ্গোলয়েড প্রভাবের প্রতিফলন আর মোহাম্মদ সোলাইমান শাহ স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী সংগ্রামী পরিচয়। দেশ ও জাতিকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে তিনি জীবন কে বাজি ধরেছেন। দেশ থেকে মগ শাসন উৎখাত করেছেন। মারাউকি আমল- স্বাধীন আরাকানের স্বর্ণ যুগ। ১৪৩০- ১৭৮৫ পর্যন্ত ৩৫৫ বছর আরাকানের রাজ্ দরবারে মুসলিম ও ইসলামী ভাবধারা এবং ঐতিহ্যের কদর ছিল। এই আমলে আরাকান রাজ্ সভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিল। এটি হঠাৎ কোন বিষয় ছিলনা এর সাথে ছিল আরাকানের মুসলিম ও রোহিঙ্গাদের বিরাট অবদান। ছিল গভীর সামাজিক ,রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক সম্পর্ক *
স্বাধীন আরাকানের মারাউকি আমলের ৩৫৫ বছর সর্ব মোট ৪৮ জন রাজা দেশ শাসন করেছেন। তারা মুসলমান এবং মাহিয়ান আরাকানি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন, ইতিহাসের পাতায় এদের সবার সিনো-মঙ্গোলয়েড নাম ও পাওয়া যায়।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যচর্চার প্রাণকেন্দ্র ছিল আরাকান রাজসভা। কিভাবে এটি সম্ভব হল ? তার যথা যথ উত্তর অনেক সময়ই আমরা পাই না এবং খুঁজি না। এ ইতিহাস অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিত। মহাকবি আলাওল, দৌলত কাজী,ক্সকোরেশি মাগন ঠাকুর, ,আশরাফ খান ,নসরুল্লাহ খান এরা সবাই ছিলেন আরাকান রাজ্যের সভাকবি বা রাজদরবারের কবি। আজকের যে বাংলা সাহিত্য তার অন্যতম ভিত্তি আরাকানের রাজসভা। আরাকানের রাজসভা স্মরণীয় হয়ে আছে বাংলা সাহিত্য চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। দীর্ঘকাল আরাকান রাজ্য পরিচালিত হয় মুসলিম ঐতিহ্য অনুসারে। প্রাচুর্যে ভরপুর ফুলে ফলে সুশোভিত দেশ হিসেবে বিবেচিত হাজার বছরের স্বাধীন আরাকান রাজ্যের অনেক রাজা ও অমাত্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। বাংলা সাহিত্য তাই ঋণী আরাকানের রাজসভার কাছে।
পদ্মাবতী, চন্দ্রাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, হপ্ত পয়কর, সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামান, শরিয়তনামা, দারা সেকেন্দারনামার মতো অনেক কালজয়ী কাব্য, মহাকাব্য রচিত হয়েছে আরাকানে। এসব কাব্যে উঠে এসেছে আরাকান রাজ্যের অনেক অজানা ইতিহাস মুসলমানদের গৌরবময় অধ্যায়। আরাকান এক সময় রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য নামেও পরিচিত ছিল । তখনকার অনেক কবি সাহিত্যিকেরা আরাকানকে রোসাঙ্গ রাজ্য বলে অভিহিত করেছেন
আরাকান ইতিহাসের স্মরণীয় কিছু দিন। :
(ক) ১০৪৪ সালে বার্মার প্যাগান রাজা অন্যারাথার আরাকান আক্রমণ।

(খ) ১৪০৬ সালে আভা রাজা মিন খং এর আরাকান আক্রমণ এবং দখল। ২৪ বছরের আভা মগদের অরাজকতার দখলি এই সময় কালে অনেক মারমা ,মোরো ,চাকমা এবং রোহিঙ্গা -অত্যাচার , নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে পালিয়ে বাংলাদেশ আসেন।
(গ) ১৪৩০ সনে রাজা নরমিখলা বাংলার মুসলিম সুলতানের ৩০ হাজার সেনা সহযোগিতায়, আরাকান স্বাধীন করেন এবং আরাকানে মারাউকি ডিনেস্টি প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজত্ব ৩৫৫ বছর স্থায়ী হয়।
(ঘ) ১৫৪৫ সালে – টংগু রাজা তা বিন সাথী। ,আরাকান আক্রমণ করেন। তার সেনা বাহিনীকে আরাকান রাজা জেবুক শাহ / মিন বিন পরাজিত করেন। আরাকানের মারাউকি আমলের স্বাধীনতা রক্ষা পায়।
(ঙ) ১৬৬০ সালে সম্রাট শাহ জাহান পুত্র মোহাম্মদ শাহ সুজা ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ভাই আওরঙ্গ জেবের কাছে হেরে আরাকান পালিয়ে আসেন। সপরিবারে তিনি আরাকান হয়ে মক্কা যাবার পরিকল্পনা করেন। ১৬৬১ সালে আরাকান রাজা চন্দ্র সুধর্মা – শাহ সুজার অপরূপা সুন্দরী কন্যা আমেনাকে বিয়ে করবার প্রস্তাব দেন এবং যৌতুক হিসাবে শাহ সুজার ধন রতœ দাবি করেন। শাহ সুজা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তিনি ষড়যন্ত্র করে পরিবার সহ তাকে হত্যা করেন। এবং রাজ কবি দিয়ে মিথ্যা ষড়যন্ত্রের কাহিনী রচনা করান। এই ঘটনাটি আরাকানের মুসলিম দের মাঝে গভীর রেখা পাত করে। রাজার প্রতি বিশ্বাস ও অখন্ড আনুগত্যে ভাঙ্গন ধরে। এই বিষয় টি আরাকানে বিভেদের কারণ হয়েছিল। এই সুযোগে বার্মা মগ আবারো আরাকান আক্রমণে উৎসাহিত হয়েছিল ।
(চ) ১৭৮৪ সালে বার্মার কন বায়ুঙ রাজা বোধা পায়া আরাকান আক্রমণ করেন।এবং শুরু হয় মগ শাসনের ৪২ বছর। এই সময়টাকে আরাকানের অন্ধকার যুগ বলা হয়। আরাকান রাজা থান বি ঘা বাংলাদেশ পালিয়ে যান এবং ১৮০৬ সাল , মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চট্টগ্রাম এবং কক্স বাজার থেকে – পালিয়ে আসা সঙ্গী , সাথী , অনুচর এবং রোহিঙ্গাদের নিয়ে স্বাধীনতা উদ্ধারে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান।
(ছ) ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ আরাকান দখল করে নেয়। এর পর আরাকান উদ্ধারের গেরিলা যুদ্ধ গতি হারায়। শুরু হয় ১২২ বছরের ইংরেজ এর উপেক্ষার আর শাসন শোষণের আমল । এই সময় বার্মা এবং আরাকানের মুসলমানেরা বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলিমরা চরম ভাবে শিক্ষা -দীক্ষায় , অর্থনীতিতে এবং স্বাস্থ্য সেবায় পিছিয়ে পড়ে । মুসলিমদের প্রতি ইংরেজ শাসন আমলে বিরূপ বিভেদ নীতি চালু ছিল। ১২২ বছরের ইংরেজ শাসন আমলে মূল বার্মায় উন্নত কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও -আরাকান এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
(জ) ১৯৪৮ সালের ৪ ই জানুয়ারি ইংরেজ বার্মা ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় বিদায় বেলায় – আরাকানকে তার পুরান প্রভু র হাতে তুলে দিয়ে যায়। সব বিচারে আরাকানের স্বাধীনতাই হত সুবিচার। যদি সংযুক্ত হওয়াই একমাত্র সমাধানের পথ হত- তবে সামাজিক , রাজনৈতিক , অর্থনৈতিক বিচারে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়াই ছিল সব থেকে যুক্তি যুক্ত। ব্রিটিশের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি তে পশ্চিমে কাশ্মীর এবং পূর্বে আরাকান হল নুতন বিভেদ রাজনীতির ফল। একই উদ্দেশ্যে ,একই ভাবে, একই কায়দায় , ব্রিটিশ শেষ মুগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বার্মার রেঙ্গুন নির্বাসনে পাঠিয়েছে। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন একজন উঁচু মানের সুফী এবং উর্দু কবি।বার্মার রেঙ্গুনে আজও তার মাজার আছে। আর বার্মার শেষ কনবাউঙ রাজা থিব মিন কে ইংরেজ ভারতের রতœা গিরি তে নির্বাসনে পাঠায়। আজ ভারতের কোথাও থিব মিন এর কোন সৃতি চিহ্ন নাই ।
সৌন্দর্য মন্ডিত , প্রাচুর্যে ভরপুর , আরাকান মগ , পর্তুগিজ , ডাচ , বাংলার সুলতান , মোগল সম্রাট , এবং ব্রিটিশ সকলের নিকট ছিল গুরুত্ব পূর্ণ। বাংলাদেশের আজকের কক্স বাজার আউট পোস্ট থেকে আরাকানের উপর নজর রাখা হত। পালনকি গ্রাম টিই , কেপ্টেন হিরাম কক্স এর নামে – কক্স বাজার নাম করন হয়েছে। কক্স এর পূর্বে ওয়ারেন হেস্টিং এখান কার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি পরে ভারতের গভর্নর জেনারেল হন।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় কক্স বাজার অঞ্চলে আয়ুব খান ব্রিটিশ সেনা বাহিনীর একটি ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন। কক্স বাজার হয়েই তিনি বার্মা যুদ্ধে যোগ দেন। পরে আয়ুব খান ,পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন।
ব্রিটিশ আমল এবং সাম্প্রতিক সময়ের বার্মা আরাকানের রাজনীতি : ১৯৩০- ২০১৭ সময় কাল।
স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের ঝুঁকি কমাতে ব্রিটিশ ধারার রাজনৌতিক কালচার সব কলোনিতেই ধীরে ধীরে চালু করেছে ইংরেজ। এর জন্য তারা একটি নির্দিষ্ট ছক ধরে এগিয়েছে। সাম্রাজ্য বাদী ইংরেজই তার উপনিবেশ থেকে সফল ভাবে এবং তুলনা মূলক শান্তি পূর্ণ ভাবে – নিজের আঁকা এক্সিট রুট দিয়ে বের হয়ে যেতে পেরেছে। বার্মার মগ কালচারের মাঝে গণতন্ত্র প্রবেশ করান সুই এর ভিতর হাতি ঢুকাবার মত কাজ ও ব্রিটিশের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে।
১৯২০ সালে রেঙ্গুন কলেজ , রেঙ্গুন বিশ্ব বিদ্যালয়ে পরিনিত হয়। রেঙ্গুন বিশ্ব বিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি দিয়েই বার্মায় পাশ্চাত্য ধারার রাজনীতির হাতে খড়ি। রেঙ্গুন বিশ্ব বিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন এবং অল বার্মা ছাত্র ইউনিয়নই প্রথম ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। সময়ের ব্যবধানে অন্যান্য সব প্রতিবাদের মুখ পত্র হয়ে দাঁড়ায় ছাত্র আন্দোলণ। বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব এই ছাত্র আন্দোলনের মাঝ দিয়েই উঠে আসে। ১৯৪৮ সালের ৪ই জানুয়ারিতে পাওয়া স্বাধীনতার পিছনে। ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্ব পূর্ণ।
১৯৩১ সালে রেঙ্গুন বিশ্ব বিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন উ নূ ,জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুর রশিদ , ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন অঙ সান। ১৯৩৫ – ১৯৩৬ সালে এবং ১৯৩৬ – ৩৭ সালে অল বার্মা ছাত্র ইউনিয়ন এর প্রেসিডেন্ট ছিলেন উ, রাশিদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন অঙ সান। জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন উ থি হ্যান। ১৯৩৬ এর নির্বাচনে poor mans party- পুওর ম্যান্স পার্টি – নেতা বা মঅ কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। বা মঅ ১৯৪১ এ জাপানের ইঙ্গিতে প্রভিশনাল সরকার গঠন করেন। বা মঅ ছিলেন এক জন জাতীয়তা বাদী স্বপ্ন বাদী নেতা। তিনি সব সময় মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন ত্রিশ বছর পর উন্নত হবে গাড়ি , বাড়ি এবং সব পরিবারে ফ্রিজ থাকবে এটা ছিল তার কথা।
অন্য দিকে অং সান ছিলেন এক জন বাস্তব বাদী নেতা কথা থেকে তিনি কাজ কে গুরুত্ব দিতেন। এক জন দূরদর্শী নেতা হিসাবেই তিনি বার্মাকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করতে পেরেছেন। ১৯৪৭ এ অং সান এর দল এন্টি ফেসিস্ট পিপুলস ফ্রিডম লীগ ((AFPFL-Anti-Fascist peoples freedom Leage.) হাউজে মেজরিটি সিট্ পায়। অং সান কে বিরোধী পক্ষ ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে , তার কেবিনেটের অনেকেই তার সাথে মারা যান। তার কেবিনেটের মিনিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ও এই হত্যা কাণ্ডে মারা যান। অংশনের মৃত্যুর পর ১৯৫৮ পর্যন্ত উ নূ দেশ চালান। উ নূর কেবিনেটে আব্দুর রশিদ সব সময় মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৬২ সালে সরকারের প্রধান হন জেনারেল নে উইন। নে উইন ১৯৮৮ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। জেনারেল নে উইনের পর সামরিক বাহিনীর উচচ পদস্থ কর্মকর্তারা (State peace and development council) এস পি ডি সি, রাষ্ট্রীয় শান্তি ও উন্নয়ন কাউন্সিল নামে সুকি র ক্ষমতা গ্রহণের আগ পর্যন্ত মিয়ানমারে ক্ষমতা পরিচালনা করেন।বার্মায় সরকার নিজেকে সোসালিস্ট পরিচয় দিতে পছন্দ করেছে। ১৯৯০ এর নির্বাচনে এন, এল ডি জয়ী হয়। এন, এল ডি র নেত্রী ছিলেন সু কি। ১৯১৫এর সাধারণ নির্বাচনে National League for Democracy -Party ,আবার বিরাট জয় লাভ করে। সু কি ২০১৬ সালে বার্মার সরকার প্রধান , স্টেট কাউন্সিলর হন। বার্মায় ১৯৬০ পর্যন্ত মুসলিম রোহিঙ্গারা নাগরিক অধিকার কিছুটা পেয়েছেন। তার পর নে উইন এর শাসন ১৯৮৮ পর্যন্ত এবং বর্তমান- ২০১৭ র সু কি র আমল শুধু বঞ্চনার ইতিহাস গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।
বার্মার স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল পালং চুক্তি। এই চুক্তির মূল কারিগর পে খিন। একজন মুসলিম। বার্মার প্রথম শাসন তন্ত্র রচনাকারী কমিটির প্রধান ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ১৯ শে জুলাই ১৯৪৭ কেবিনেট মিটিং চলা কালীন সময় বিরোধী পক্ষের ব্রাশ ফায়ারে – অং সান সহ মারা যান। বার্মার বিখ্যাত শাসন তন্ত্র বিশেষজ্ঞ আইন জিবি কো নি কে প্রকাশ্যে এয়ার পোর্টে ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ গুলি করে বিদেশ থেকে ফিরবার পর গুলি করে মারা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই বিজয়ী হয়ে মুসলমানেরা পার্লামেন্ট হাউজে বসেছে। তার পরও বলা হচ্ছে রোহিঙ্গারা আরাকানের নাগরিক না।
ইংরেজ আমলে চাকুরী জীবি, রাজ্কর্মচারি,ব্যবসায়ি এবং সাধারণ ভারতীয়রা ছিল রাজধানী রেঙ্গুনের জন সংখ্যার প্রায় ৫৫% তারা ১৯৪৮ ইংরেজ শাসন অবসানে দলে দলে ভারত ফিরে আসেন । এদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের তুলনা চলেনা। ভারতীয়রা ছিল ইংরেজ দের বিশেষ সুবিধা ভোগী শ্রেণী। অপর দিকে রোহিঙ্গারা ছিল ভূমি পুত্র এবং বঞ্চিত জনগুষ্টি। ইংরেজ শাসন আমলে ইংরাজের মুসলিম বিদ্বেষী পরিচয় রোহিঙ্গারা ও পেয়েছে।
ইতিহাস পর্যালচনায় দেখা যায় যে – আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘ দিনের। মগদের হাতে স্বাধীন আরাকান পরাধীন হবার পর থেকে , ব্রিটিশ ও তৎ পরবর্তী নির্যাতন, নিষ্পেষণের ইতিহাস একই। অপ রাজনীতির দাবার চালে সেই পুরান ছক ও অত্যাচারী সব সময় নিপীড়িতের উপর মিথ্যা দোষারোপ করে নিজের অপকর্মকে ঢাকতে চায়। গদ বাধা ব্লেম। সন্ত্রাসী , জঙ্গি , বিছিন্নতা বাদী, বিদেশির চর ইত্যাদি। প্রচারের মাধ্যমে অনেক ধরণের অসত্য এবং বিব্ভ্রান্তি ছড়ান হয়েছে।
আজ মিথ্যা অভিযোগে অধিকার কামি এক জাতিকে তার জাতি সত্ত্বা অস্বীকার করে , নাগরিকতা এবং নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে বিশ্বের সামনে তাদের জঙ্গি ,মাদক পাচারকারী বলে অপো প্রচারেই কি সব মিটে যাবে ? চীন , রাশিয়া , ভারতের মদদে বার্মা সারা বিশ্বকে করছে উপেক্ষা। রাশিয়া , ভারত , চীন আজ নিজ স্বার্থে অন্ধ। সত্যকে করছে অস্বীকার। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য কে নিয়ে খেলছে।
ভারত এবং বার্মা বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী। ধর্ম নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতে এক শ্রেণীর উগ্র হিন্দুত্ব বাদী হিন্দু গোরক্ষার নামে মুসলিম হত্যার লাইসেন্স খুঁজে। সমাজতান্ত্রিক বৌদ্ধ বার্মায় ছাগল কুরবানীতেও জীব হত্যা মহা পাপ বলে এক শ্রেণীর উগ্র বৌদ্ধ মুসলিম হত্যার লাইসেন্স খুঁজে।
চীন বিষয় টি বার্মার অভ্যন্তরীণ বিষয় বলছে। যা সে পূর্বেও বলেছে। প্রয়োজনে বার্মার পক্ষে শুধু ভোট নয় , ভেটো ও দেবে এ আশ্বাস সে দিয়ে রেখেছে। চীনের আছে বার্মার উপর সমর ও অর্থ নীতির প্রভাব। চীন ও রাশিয়া এমনকি উদ্বেগ জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে বিবৃতি দিতে রাজি হয়নি। ভারতে উগ্র বর্ণবাদী দল ক্ষমতায়। তারা হিন্দু মৌলবাদী জাতীয়তাবাদকে উসকে দিতে চাইছে। সু চি-মোদির যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে – তারা নাকি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় লড়াই করতে একমত। এর মাধ্যমে ভারত কার্যত সু চির বর্ণবাদী গণহত্যার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
ভারত রোহিঙ্গাদের জঙ্গি ও তার নিরাপত্তার হুমকি বলে জানিয়ে রেখেছে, তার অবস্থান টা যে নিজস্ব ভূ রাজনীতি ও অর্থনৌতিক স্বার্থের সাথে বাধাঁ তা পরিষ্কার করেছে । বার্মা ইঙ্গিতটা ভালই বোঝে। এটা দূরদর্শী চাল। বাংলাদেশ কে তার ইচ্ছার অধীনে রাখার কৌশল।
রোহিঙ্গা ইতিহাস পাঠেই আমরা জানতে পারব ওরা কে ? আমাদের সাথে ওদের সম্পর্ক কি ? আরাকানে ৫/৬ শত বছরের উপর অবস্থান কালে রাজ্য শাসন থেকে- তারা অনাবাদি জমিকে আবাদি সবই করেছে ।জানতে হবে তার আগে তারা কোথায় ছিল ? রোহিঙ্গাদের সাথে বাংলাদেশের মানুষের ভাষা , ধর্ম, চেহারা তে একটা মিল আছে। আমরা কখনও তা অস্বীকার করতে পারব না। করলেও কথা টা ঘুরে ফিরে আসবেই। দীর্ঘ দিন ধরে পরিকল্পিত ভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে, অভ্যন্তরীণ ও বহির বিশ্বের সাথে বিচ্ছিন্ন রেখে, উদ্যোগী অর্থনীতির পথ বন্দ করে, অস্বাস্থ্য, অশিক্ষা, কু শিক্ষা দিয়ে, রোহিঙ্গাদের জাতি সত্তা ধ্বংসের সমস্ত আয়োজন শাসক কুল করেছে।
আজ ওদের প্রয়োজন সাহস , শক্তি ও শিক্ষা ফিরিয়ে দেওয়া। ইতিহাস কে ফিরিয়ে দেওয়া। জানান দেওয়া এই রোহিঙ্গা এক দিন আরাকান রাজ্ সভাকে শিল্প , সাহিত্যে করেছিল আলোকিত।

আজ আমরা রোহিঙ্গাদের রিফিউজি ক্যাম্প দেখছি – আরাকান থেকে রিফুজি আসা এটিই প্রথম নয় , – ইতিপূর্বে ১৭৮৪ কন বায়ুঙ রাজা বোধা পায়ার আমলের দুঃশাসন , হত্যা , নির্যাতনের মাঝে, মারমা, মোরো, চাকমা, আরাকানি মাহায়ানা বৌদ্ধ এবং রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশ এসেছে । মারমা এবং চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রাম বসতি করে। রাজা মিন খং আমলে ও এই একই ঘটনা হয়েছে। আরাকান থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রাম বসতি করা মারমা , মোরো , চাকমারা প্রধানত লাওস , থাইল্যান্ড , এবং বার্মার ক্ষুদ্র নৃ মন, সান এবং করেন দের দূর আত্মীয়।
১৭৯৯ / ১৮০০ সালের মাঝে শুধু মাত্র কক্স বাজারেই এক লাখের উপর রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। আজকের সু কি আমলের রিফিউজি – রোহিঙ্গা মায়ের অসহায়, দুঃখি চেহারা, করুন বদনে আছে চার চারটি বর্বর শোষকের বর্বরতার এবং নির্যাতনের ছাপ। আভা রাজা মিন খং এর ২৪ বছরের অরাজকতার দখলি শাসন, ১৭৮৪ সালে কনবাউঙ রাজা বোধা পায়ার ৪২ বছর দুঃশাসনের অন্ধকার যুগ। ১৮২৬ সালে ১২২ বছরের ইংরাজের ডিভাইড এন্ড রুলের সুবিধাবাদী, স্বার্থান্নেষী শোষণের যুগ- ১৯৪৮ সাল থেকে বর্তমান মিয়ানমারে সুকি দের বর্বরতার যুগ।

সিঙ্গাপুরে মালয় বংশ ঊদ্ভুত, মালয়েশিয়াতে চাইনিজ বংশ ঊদ্ভুত, দক্ষিণ আফ্রিকাতে সাদা, এবং মরিশাসে ভারতীয় বংশ উদ্দ্ভুতরা নাগরিক হয়ে সব অধিকার নিয়ে যদি সম্মানের সাথে থাকতে পারে – তবে সেই একই সূত্রে বাংলাদেশী বংশ ঊদ্ভত রোহিঙ্গারাও ,আন্তরজাতিক আইনেই বার্মায় সব অধিকার সহ সন্মান নিয়ে থাকবার অধিকারী।
ভারত, চীন আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশ- রোহিঙ্গা বিষয়ে তাদের স্বার্থ এবং নীতির সাথে আমাদের স্বার্থ ও নীতির মৌলিক পার্থক্য আছে। চীনের বড় অর্থনীতি আর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব যেন আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে না পারে। ভুল হিসাব কোষে ধরা খেলে, আমাদের প্রচন্ড ক্ষতি বয়ে আনবে। তাদের প্রচারের সব সুর ও তালে -যেন আমরা তাল না দেই । জঙ্গি বিষয়ে বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতি বিশ্ব জানে। নুতন করে এখন বেশি করে বলতে গেলে -এই বিষয়টি বার্মার কাছে ভিন্ন সিগন্যাল হিসাবেই যাবে।
মূল কথা ভারত সহ চীন রাশিয়া নিজ স্বার্থে ই রোহিঙ্গা প্রশ্নে তাদের নীতি নির্ধারণ করছে যা আমাদের স্বার্থের পক্ষে যায় না। বাংলাদেশকে তার নিজ স্বার্থেই রোহিঙ্গা সংকটে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। সে জন্য রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত জাতীয় ঐক্যভিত্তিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ,প্রজ্ঞাশীল নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।

মাহবুবুর রব চৌধুরী
টরন্টো

লেখক পরিচিতি: সংগঠক ও গবেষক এবং কানাডার টরন্টোয় আয়োজিত উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন ২০০০ ফোবানা’র আহবায়ক।

মন্তব্য (3) “রোহিঙ্গা ইতিহাস: বাংলাদেশ, বার্মা ও আরাকান প্রেক্ষাপট 

মন্তব্য to m. chowdhury