রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ

Rohingyarohinga 1ইউনাইটেড কানাডিয়ানস্ ফর গ্লোবাল হিউম্যনিটির উদ্যোগে রহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১লা ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭ টায় স্থানীয় ৯ ডজ রোডস্থ কানাডিয়ান লিজিয়ন হল এ এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় প্রায় শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা সভার শুরুতে রোহিঙ্গা সমস্যা ও বর্তমান অবস্থার উপর নির্মাণ করা ১০ মিনিটের একটি প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শণ করা হয়। প্রামাণ্য চিত্রটিতে রোহিঙ্গাদের অমানবিক অবস্থা দেখে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। (ইউটিউব এর লিঙ্ক:https://youtu.be/5UJ6jmDM4sW))
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি জনাব শামসুল ইসলাম, স্কারবরো সেন্টার এর এম. পি. মিস সালমা সাহিদ, অন্টারিও এর সাবেক ডিপুটি প্রিমিয়ার জর্জ স্মিথারম্যান, এমপ্লয়মেন্ট লেবার এন্ড হিউম্যান রাইটস্ আইনজীবী মিস্ মুনিজা শেখ, স্কারবরো সাউথ ওয়েষ্ট এর এম. পি. বিল ব্লেয়ার এর রাইডিং অফিস ম্যানেজার সরোয়ার চৌধুরী সি. এ., স্কারবরো নর্থ এর এম. পি. সান চেন এর প্রতিনিধি মিস্ এরিয়েন বশির, কমিউনিটির নেতা ও টরোন্টো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সাবেক সভাপতি জাবেদ আলী খান, টরোন্টো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রশাসক শাকিল আক্তার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাবেক সিবিসি রিপোর্টার ফুয়াদ চৌধুরী, বার্মা টাস্ক ফোর্স কানাডার ফেরাজ আজিক এবং কানাডা রোহিঙ্গা ডেভেলাপমেন্ট ইনিজিএটিরস্ এর প্রোগ্রাম কঅর্ডিনেটর ফরিদ উল্যা প্রমুখ।
জনাব সামসুল ইসলাম তার স্বাগত ভাষণ এ বলেন বাংলাদেশ ধনী দেশ নয় কিন্তু ১০ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশ আর্থিক ক্ষেত্রে ধনী না হলে মানবিক ক্ষেত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী।
উল্লেখ্য যে,জনাব শামসুল ইসলাম টরোন্টো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তিন সদস্য বিশিষ্ট রিলিফ টিমের কোঅর্ডিনেটর হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশে যান এবং স্থানীয় প্রশাসনের ও রিফিউজি ক্যাম্পের তত্ত্বাবধানে থাকা বাংলাদেশ আর্মিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা সাপেক্ষ্যে স্থানীয় বাজার থেকে রোহিঙ্গাদের বিশেষ চাহিদা অনুযায়ী, খাদ্য, বস্ত্র, সেল্টারের জন্য তেরপাল সংগ্রহ করে টিমের অন্যান্য সদস্য সহ রোহিঙ্গা রিফিউজিদের মাঝে সরাসরি ১৪ ট্রাক মালামাল বিতরণ করেন যার আর্থিক মূল্য কানাডিয়ান ২ লক্ষ ডলার।
জনাব ইসলাম আরো বলেন, ইউনাইটেড নেশনস্ এর চার্টার অব হিউম্যান রাইটস্ অনুযায়ী এ পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে মানুষ হিসেবে বেচে থাকার অধিকার তার মৌলিক মানবিক অধিকার। অথচ রোহিঙ্গা জাতির উপর দীর্ঘসময় ধরে যেভাবে মায়ানমার সরকার অমানবিক নির্যাতন করে আসছে তা বর্তমান বিশ্বে নজির বিহীন। তিনি আরো বলেন মানুষের উপর এই অমানবিক নির্যাতন বর্তমান সভ্য পৃথিবীর জন্য লজ্জ্বার বৈকি।

তিনি আরো বলেন, আগামী জানুয়ারীর মধ্যেই প্রায় ৭২,০০০ রোহিঙ্গা শিশু বাংলাদেশে অবস্থিত আশ্রয় শিবিরে জন্মগ্রহণ করবে।
জনাব ইসলাম বলেন, মায়ানমারের নেত্রী আন্ সান্ সু কী মায়ানমারে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার সাহসী ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তি পুরষ্কার ভূষিত হন, অথচ বর্তমানে তাঁর সরকারের অধীনে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বন্ধের জন্য, মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য বিশ্বে তার ই কাছে অনুরোধ করছে তা অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের।
জনাব ইসলাম বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বেচে থাকার জন্য সবাইকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ সরবরাহ ও বিতরণ করার আহবান জানান এবং একই সাথে সবাইকে সমগ্র কানাডা এবং সারা বিশ্ব ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদের আওয়াজ তোলার আহবান জানান যাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি অনতিবিলম্বে মানবিক মর্যাদা নিয়ে তাদের মাটি মায়ানমারে ফিরে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে সালমা জাহিদ এম. পি. বলেন তাঁর সরকার ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। প্রধান মন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো রোহিঙ্গাদের সমস্যা সরেজমিনে দেখা জন্য অন্টারিওর সাবেক প্রিমিয়ার বব রে’কে বিশেষ দূত হিসাবে নিয়োগ দেন।
উল্লেখ্য যে, বব রে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেছেন এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রকৃত অবস্থার বিবরণ তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কাছে যা আগামী জানুয়ারী মাসে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সালমা আরো জানান, তিনি তার অন্যান্য সহকর্মী এম. পি. দের সহ একত্রে রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য শামসুল ইসলামকে ধন্যবাদ জানান এমপি সালমা।
সাবেক ডিপুটি প্রিমিয়ার জর্জ স্মিথারম্যান বলেন, যে কোন উপায়ে বিশে^র মানবতাকে রক্ষা করতে হবে এবং মানবতাকে রক্ষার কোন সিমানা নাই। রোহিঙ্গাদের সমস্যা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কানডিয়ানদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে একত্রিত করার উদ্যোগের জন্য ইউনাইটেড কানাডিয়ান ফর গ্লোবাল হিউমিনিটিকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো বলেন, এই সমস্যা শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সমস্যা নয়। এটা একটি মানবিক সমস্যা। অতএব, এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের সবাইকে একত্রে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান পৃথিবীতে কোথাও কোন অমানবিক নির্যাতন ঘটলে তা গোটা পৃথিবীকে আক্রান্ত করে। তাই রোহিঙ্গ সমস্যাকে আর দীর্ঘায়িত করা যাবে না।
জনাব সান চেন এম. পি. তার প্রতিনিধি এরিয়ান বশির এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সম্বন্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগের জন্য ইউনাইটেড কানাডিয়ান্ ফর গ্লোবাল হিউমেনিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জনাব সান চেন তার প্রদত্ত নোট এ বলেন এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একদিকে যেমন কানাডিয়ানরা রোহিঙ্গাদের বর্তমান সমস্যা এবং নির্যাতনের বিষয়ে আরো ধারণা পাবে তেমনিভাবে তাদের মাঝে রোহিঙ্গাদের সমস্যার বিষযে আরো সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
জনাব বিল ব্লেয়ার এম. পি. তার প্রতিনিধি সরোয়ার চৌধুরীর মাধ্যমে আজকের অনুষ্ঠানের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সরোয়ার চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন এবং বলেন, বিল ব্লেয়ার এম. পি. সর্বদা আমাদের কমিউনিটির সমস্যা দেশে অথবা দেশের বাহিরে সমাধানের ক্ষেত্রে খুব আন্তরিক।
ডাঃ রেজা মরিদি তার শুভেচ্ছা নোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং ইউনাইটেড কানাডিয়ান ফর গ্লোবাল ইউনিয়কে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক অধিকার অর্জনের জন্য আজ সারা পৃথিবীর সাথে আমরাও তৎপর। তাদের সমস্যার আশু সমাধান করতেই হবে।
মিস্ মুনিজা শেখ তার বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গা নারীদেরকে মায়ানমারের মিলিটারীরা তাদের সন্তানদের সামনেই রেপ করেছে। এমনকি তাদের পাশবিক অত্যাচার থেকে অল্পবয়সী মেয়েরাও রেহাই পায় নাই। তিনি আরো বলেন, মায়ানমারের যে সমস্ত মিলিটারী নারী ও মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করেছে তাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে।
জনাব ফরিদ উল্যা বলেন, তিনি দীর্ঘ ১৪ বৎসর রিফিউজি ক্যাম্পে ছিলেন। তার রিফিউজি থাকা অবস্থার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, – ঐ জীবন খুব কষ্টের যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, মায়ানমারের সরকার দীর্ঘ পরিকল্পনার মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের উপর পর্যায়ক্রমে নির্যাতন করেছে। তারা প্রথমে যুবক রোহিঙ্গার হত্যা করেছে এবং কাউকে কাউকে দীর্ঘদিন কারাগারে রেখেছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা জাতিকে প্রথমে যুবকবিহীন জাতি হিসাবে রাখা। যখন তাদের এই পরিকল্পনা সফল হয়, তখন তারা চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় বুড্ডিস সহ একত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমনে ঝাপিয়ে পড়ে এবং রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে বিতাড়িত করে।
জনাব জাবেদ আলী খান বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুর শুধুমাত্র মানবিক সমাধান করলে চলবে না, এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানও করতে হবে। তিনি আরো বলেন, জাসটিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড।
জনাব শাকিল আক্তার তার বক্তব্যে বলেন, আমরা সর্বদা আমাদের জন্য ভালো জীবন যাপন এর পরিকল্পনা করি। আমাদের ছেলেমেয়েদের ভালো জীবনের পরিকল্পনা করি। এমন কি কেউ কেউ তাদের নাতি-নাতনীর ভালো জীবনের জন্য পরিকল্পনা করি। কিন্তু একবার ভাবুন, বাংলাদেশে ত্রাণ বিতরণের সময় আমরা যা দেখেছি তা মর্মান্তিক।
জনাব ফুয়াদ চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, এটা অত্যন্ত দু:খের বিষয় যে পোপ ফ্রান্সিস বার্মা এবং মায়ানমার উভয় দেশ সম্প্রতি সফর করেছেন, কিন্তু জাতিসংঘ স্বীকৃত এথনিক ক্লিংজিন শব্দ একবার ও উচ্চারণ করেননি। অথচ তিনি রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে নিজেই সেই ভয়াভহ নির্যাতনের কথা শুনেছেন।
জনাব ফুয়াদ আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের মোদি সরকার এর চাইতে ভারতের জনগণের কণ্ঠ অনেক অগ্রগামী।
অনুষ্ঠানের সার্বক্ষণিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বার্মা টাস্ক ফোর্স কানাডার প্রতিনিধি জনাব ফিরাজ আজিক। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

 

বিশ্বের  বিশ্ব

মন্তব্য