সুমন আমার বন্ধু

Bidut Sarker

বিদ্যুত সরকার

ও’র নাম সুমন। আমার বন্ধু। শৈশব, কৈশর, যৌবন সব অধ্যায়েই সুমন আর আমি পাশা-পাশি। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি-সবগুলোতেই আমাদের একসাথে, এক পথে বিরামহীন অন্তহীন যাত্রা। স্বর্ণলতার মতোন জড়িয়ে থাকা একে অপরের অস্তিত্বে, আত্মার সত্ত্বায়। যেমন মেঘ ছুঁয়ে দেয় রোদ্দুর, বন্ধুত্ব ছুঁয়েছে স্বপ্ন – এগিয়ে চলার স্বপ্ন। সুমনের খুব প্রিয় যে কোন গ্রাম যেমন আমার। গ্রামের দৃশ্যমান সবুজতা, বহমান জলবায়ূ, উর্বর মৃত্তিকা এক অন্তরঙ্গ পরিবেশের উপমা গড়ে তোলে, রচিত হয় সুখের আবাসন।

ও’র কথা মনে হলেই আমার শৈশব, আমার স্মৃতিরা সম্মুখে এসে দাড়ায়। শৈশবের সিংহভাগ জুড়েই ওর ছায়া-প্রতিচ্ছায়া। আমি হাটছি সেও হাটছে। কখনো কখনো ওর ছায়া। মেঘনার নির্মম ভাঙ্গনে মমতাময় নিরিহ আবাসটুকু কিছু না জানিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেল। সেই থেকেই ওরা ঠিকানা বিহীন। জলের গভীরে স্মৃতিরাও বুঝি গলে গলে মিশে আছে ঢেউয়ের পরতে পরতে। স্মৃতিগুলো একসময় সত্যি সত্যি টুকরো টুকরো গল্প হয়ে গেল। ও বলতো গল্পগুলো আমি মন দিয়ে শুনতাম। এভাবে আমরা পরস্পরের ভাললাগার মনকে ছুঁয়ে দিলাম। নদীর ভাঙ্গন যেন গড়ে দিল এক অদ্ভূত বন্ধুত্বের বন্ধন, শান্তির নীড়। যা কি-না এখনও অটুট। সূর্যের উত্তাপ যেমন পায় তেমনি সমূহ চাঁদের আলোর øিগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে চারিদিক। সুমনরা চলে এলো আমাদেরই গ্রামে, নতুন বসত অচেনা মাটির গন্ধ, অচেনা জন-মানব। শুধু চেনা আকাশ, চেনা জল, জলের স্রোত আর গ্রামের সবুজতা। আমাদের স্কুলের একই ক্লাসের সহপাঠী। সুযোগ হলেই দু’জনে একসাথে ঘুরতাম ফিরতাম। বনজ ফুল আর ফল আমাদের খেলার উপকরণ, অনুষঙ্গ হয়ে যেত। নানা বর্ণের ফুল, ফুলের পাপড়ি চোখের মাঝে রং ছড়াতো, বুকের ভেতর সুঘ্রাণ বয়ে আনতো। তেমনি করে ফল, ফলের বিচি মুখে আস্বাদ বিতরণের পাশা-পাশি খেলার উপকরণ হয়ে যেত, যেমন – ফুটবল, গুলতির গুলি বা ঘুর্ণায়মান লাটিম। গুলতির ফাঁক দিয়ে যেমন পাখি খুঁজতাম তেমনি বনজ সৌন্দর্য অবলোকন করতাম। ও সত্যি সত্যি একদিন একটি দোয়েলকে গুলতির অব্যর্থ নিশানায় মৃত্তিকার কোলে নিয়ে এসেছিল। দোয়েলকে এমন অসহায় দেখে সেদিন তার ভীষণ মায়া জন্মে যায়। দোয়েলের চক্চকে কালো চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে তার চোখও কেমন ছল ছল হয়ে উঠেছিল সেদিন। সে দুঃখ জাগানিয়া স্মৃতি এখনও ওকে বিচলিত করে। বিশেষ করে কার্জন হলের সম্মুখে শান বাঁধানো মস্ত দোয়েল দুটোকে দেখলে। লাটিমের ঘুর্ণন যেমন তাকে শিহরণ যোগান দিতো, রঙ্গিন ফুলেল দৃশ্যগুলোও এনে দিত প্রশান্তি। এক সময় ওর শিহরিত অনুভূতি, অনাবিল প্রশান্তি আমাকেও প্রভাবিত করে নিলো।  সে সময় থেকেই যৌথ উদ্যোগে, উদ্যোমে অনুভূতিগুলোকে অধিকতর শানিত করার পথ খুঁজে পেলাম। প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে একটি সেতু নির্মানে প্রত্যয়ি হয়েছিলাম আমরা দুজন। প্রায় প্রতিদিনই দু’জন রমনায় যেতাম, কখনো বোটানিক্যাল গার্ডেনে, ফুল আর পাতার বৈচিত্রে চিত্রিত করতাম মনের ক্যানভাস, রঙ্গিন হতো হৃদয়ের চার দেয়াল। ফুলের রঙ ও ফলের আকৃতি কীভাবে যে ভাললাগার এমনকি ভালবাসার বিষয়বস্তু হতে পারে সেতো সুমনই আমাকে শিখিয়ে ছিল। ওর চোখের ভিতর আরও এক অন্তর্চক্ষু বিরাজ করতো বলেই না এতোটা গভীরে দৃষ্টি মেলে ধরার ফুরসত পেতো। সুখের চাদরে, পরিচিত হাতের আদরে অন্তরঙ্গতা তরঙ্গায়িত হয়, বন্ধুত্বের গভীরতা অনন্তের পথে চলতে থাকে। টিএসসি’র সবুজ ডিভানে শুয়ে-বসে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক হাজার রজনীর গল্প। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বিকেলের রোদ পালানোর গান। টিএসসি দূরে ঠেলে দিয়ে শাহবাগের অডিটরিয়ামে চলমান শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এ ঢু মারা। রতের কুয়াশায় ঢেকে যায় ঢাকা। ঢাকার চঞ্চলতা, চপলতা থিতু হয়ে আসে ক্রমশ:। রাত সমর্পিত হয় অন্ধকারের গভীরে। দেয়ালের পেরেকে ঝুলানো মশারির ন্যায় আমার ভাবনাগুলোও নেমে আসে আমার চারিধারে। কত্তো কি ভাবনা, সমস্তটা জুড়েই আমার গ্রাম-নীরব, কোলাহল বিহীন সবুজে সবুজে ছাওয়া আমার গ্রাম, আমার বাড়ি, বাড়ির নিকনো উঠোন। উঠোনের চারিদিক জুড়ে আম, জাম, নাড়িকেল, জামরুলের সমারহ। নাড়িকেলের পাতা চুঁয়ে চুঁয়ে সকালের রোদের ঝিলিক নেমে আসে বাড়ির আঙ্গিনায়। আলোকিত আঙ্গিনায় উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে বিছনো ধানের শরীরে।

একাত্তরের এক বিকেলে হৃদয়পুর স্টেশনে অপেক্ষা করছিলে বনগাঁ গামী ট্রেনের জন্যে। দু’জনে বাদামের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে স্বপ্ন দেখছিলাম লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশে ফিরে যাবার। বলেছিলে কিছুদিনের মধ্যেই দেশ স্বাধীন হবে। যুদ্ধ শেষ করে সরাসরি গ্রামে ফিরে যাবে তুমি। জানি, তোমার গ্রাম তোমার কাছে অধিক প্রিয়। চেনা আকাশ, বাঁকা মেঠে পথ, দূরে ময়নামতি পাহাড় – সব তোমার একান্ত ভালবাসার বিষয়-আসয়। শিকড়ে বাঁধা মাটি। বড় চেনা, অতি চেনা সে মাটির সুঘ্রাণ নিতে যুদ্ধ শেষে ফিরে গেলে তোমার প্রিয় গ্রামে। অথচ, এতোসব প্রিয় স্থাবর-অস্থাবর বিষয় দূরে ঠেলে দিয়ে এক প্রত্যুষে লাল সূর্যকে সাক্ষী রেখে চলে গেলে কোন এক অজানা ঠিকানায়। ধুসর কোন আলো অনাদরে ভাসিয়ে দিয়ে গেলে অথৈ সাগরে। জানলে আমার ভীষণ কষ্ট হবে ভেবে কিছু না বলেই তুমি নিরুদ্দেশ হলে তোমার প্রিয় লাল-সবুজের দেশ থেকে অন্য কোন দেশে। বৈষম্য, অন্যায়, হীনমন্যতা, অবহেলা, ঘৃণা এ সমস্ত কিছুই তোমার চলে যাবার জন্য যথেষ্ট কারণ ছিল বৈকি। বৃষ্টি ভেজা প্রাণ আর অশ্র“ভেজা চোখ কতটুকু অসহিষ্ণু হলে একজন প্রকৃত যোদ্ধা আত্মসমর্পণ করে ফেলে নিজের অজান্তেই। তুমি তাই করলে সুমন। তোমার লাল-সবুজের পতাকা কোমন অচেনা হয়ে গেল! তোমার প্রিয় সবুজ গ্রাম, ঘাসের নম্রতা, কাশ ফুলের বিহ্বলতা, বৃষ্টি ভেজা মাটির সোদা গন্ধ – সব কিছু সত্যি কি বড় অচেনা হয়ে গেল তোমার?

 

- বিদ্যুত সরকার, টরন্টো

মন্তব্য