ইমিগ্রেন্টদের একটা অংশ রাতে একা বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তার অভাববোধ করেন

আরব দেশসমূহ এবং ইরাক আফগানিস্তান থেকে আসা ইমিগ্রেন্টরা রাতে বাস বা সাবওয়ে স্টেশন থেকে অথবা কোন স্টোর থেকে একা পায়ে হেটে বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তার অভাববোধ করেন। ছবি : টরন্টো স্টার

আরব দেশসমূহ এবং ইরাক আফগানিস্তান থেকে আসা ইমিগ্রেন্টরা রাতে বাস বা সাবওয়ে স্টেশন থেকে অথবা কোন স্টোর থেকে একা পায়ে হেটে বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তার অভাববোধ করেন। ছবি : টরন্টো স্টার

রাতে নিজ এলাকায় একা ঘোরাফেরা করাটাও নিরাপদ মনে করেন না তারা

প্রবাসী কণ্ঠ : কানাডায় ইমিগ্রেন্টরা বিশেষ করে আরব দেশসমূহ এবং ইরাক আফগানিস্তান থেকে আসা ইমিগ্রেন্টরা রাতে বাস বা সাবওয়ে স্টেশন থেকে অথবা কোন স্টোর থেকে একা পায়ে হেটে বাসায় ফেরার সময় নিরাপত্তার অভাববোধ করেন। তারা যে এলাকায় থাকেন সেই এলাকায় রাতে একা ঘোরাফেরা করাটাও নিরাপদ মনে করেন না। স্ট্যাটিসটিকস কানাডার এক নিরীক্ষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ১২ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় নিরীক্ষার এই ফলাফল।

স্ট্যাটিসটিকস কানাডা উল্লেখ করে, বেশীরভাগ ইমিগ্রেন্ট বাস করে কানাডার বৃহৎ সিটিগুলোতে যেখানে তাদের নিরাপদ বোধ করার অনুভূতি তুলনামূলকভাবে কম।

আরবদের মধ্যে এই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার হার শতকরা ১৫ ভাগ এবং পশ্চিম এশিয়া অর্থাৎ আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে আসা ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে এই হার ১৬%। তবে শতকরা ৪৪ ভাগ ইমিগ্রেন্টই মনে করেন তারা রাতের বেলায় একা চলাফেরা করার সময় বেশ নিরাপদ বোধ করেন।

বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে ধারণা করা হয় যে, সাধারণভাবে ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে রাতে একা চলাফেরা করার সময় ভীতিটা কাজ করে হেট ক্রাইম এর শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থেকে। সম্প্রতিক পুলিশ রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, আরবীয় এবং অন্যান্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে হেট ক্রাইম বৃদ্ধি পেয়েছে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন হামলার সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় লাফিয়ে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

গত জুলাই মাসে প্রকাশিত নতুন তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলার ১৫৯টি ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে যা তার আগের বছর ছিলো ৯৯টি।

সিবিসি নিউজের খবরে বলা হয়, কানাডীয় মুসলিমদের জাতীয় কাউন্সিলের ভাইস-চেয়ারম্যান খালিদ এলগাজার ২০১৫ সালকে কানাডার মুসলমানদের জন্য একটি ‘কঠিন বর্ষ’ হিসাবে উল্ল্লেখ করেন।

এলগাজার বলেন, বিদ্বেষমূলক হামলার শিকার অনেক মুসলিমই হামলার ঘটনা পুলিশকে জানান না, কারণ ভীত-শঙ্কিত থাকেন যে পুলিশকে জানালে তাদেরকে আরও হেনস্তা হতে হবে অথবা তারা ভাবেন যে, পুলিশ কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে না।

রাতে একা চলাফেরা করতে ভয় পাওয়ার আরো একটি কারণ, এই ইমিগ্রেন্টদের অধিকাংশই থাকেন এমনসব এলাকায় যেখানে দারিদ্রতা একটি সাধারণ বিষয়। দারিদ্রপীড়িত অঞ্চলে এমনিতেই অপরাধের মাত্রা একটু বেশী থাকে।

এপার্টমেন্টবাসীরাও নিরাপত্তার অভাববোধ করেন

কানাডায় যারা ৫ তলা বা তারো বেশী তলার এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এ থাকেন তারাও কম নিরাপত্তা বোধ করেন যদিও ঐ ভবনগুলোতে লোকজনের সমাগম বেশী এবং কোন কোন ভবনে নিরাপত্তা প্রহরীও থাকে। আরো থাকে ক্লোস সার্কিট টিভি মনিটরিং এর ব্যবস্থা। এপার্টমেন্ট বিল্ডিংগুলো সাধারণত কানাডার বড় শহরগুলোতেই বেশী। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বড় শহরগুলোতেই ইমিগ্রেন্টদের বসবাস বেশী যেখানে তাদের নিরাপদ বোধ করার অনুভূতি তুলনামূলকভাবে কম।

তবে বেশীরভাগ কানাডিয়ান বলেন, তারা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে খুশী অথবা খুবই খুশী। অর্গানাইজেশন ফর ইকনমিক কো-অপারেশন এ্যান্ড ডেভলাপমেন্ট এর হিসাবে বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশের মধ্যে কানাডার জনগণের নিরাপত্তাবোধের অনুভূতি বেশ দৃঢ়।

কানাডিয়ানরা আসলে ক্রমবর্ধিতভাবে আরো বেশী নিরাপদ বোধ করছেন। হিসাবে দেখা গেছে অর্ধেকেরও বেশী কানাডিয়ান বলেন, রাতের বেলায় তারা নিজ নিজ এলাকায় একা ঘোরাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন। ১৫ বছর আগে এই নিরাপত্তা বোধের মাত্রা আরেকটু কম ছিল। সেই সময় প্রতি ১০ জনের ৪ জন মনে করতেন তারা নিরাপদ বোধ করেন।

অন্যদিকে স্ববিরোধী মনে হলেও ৭৪% ভাগ কানাডিয়ান মনে করেন গত ৫ বছরের মধ্যে অপরাধের মাত্রা একই অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সময়ের মধ্যে আসলে অপরাধের মাত্রা কমেছে। স্ট্যাটিসটিকস কানাডা এই তথ্য দেয়।

কানাডার বিভিন্ন প্রভিন্সে, যেখানে অপরাধ মাত্রা কম সেখানে লোকজন বেশী নিরাপদ বোধ করেন। দেখা গেছে আটলান্টিক প্রভিন্স (নিউ ব্রাঞ্চউইক, নিউফাউন্ডল্যান্ড এন্ড ল্যাব্রাডর, নোভাস্কোশিয়া এবং প্রিন্স এ্যাওয়ার্ড আইসল্যান্ড) ও অন্টারিও প্রভিন্সে বসবাসকারী কানাডিয়ানরা তুলনামূলকভাবে বেশী নিরাপদ বোধ করেন। এর মধ্যে প্রমানিত হয় যে, অপরাধ এর মাত্রার সঙ্গে নিরাপদ বোধ করার একটি যোগসূত্র রয়েছে। এই প্রভিন্সগুলোতে অপরাধের মাত্রা কম।

বস্তুত : কানাডায় গুরুতর অপরাধের মাত্রা গত ৪৬ বছরের মধ্যে সর্বনিন্ম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর সর্বাধিক নিরাপদ শহর এখন টরন্টো। স্ট্যাটিসটিকস্ কানাডার জরীপ রিপোর্টে এমন তথ্যই উঠে এসেছে ইতিপূর্বে। স্ট্যাটিসটিকস্

কানাডা প্রতিবছর অপরাধ তীব্রতার সূচক প্রকাশ করে থাকে। কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে মাথাপিছু অপরাধের মাত্রা কত তা নির্ধারণ করতে গিয়ে এই সংস্থাটি মানুষহত্যাসহ গুরুতর অপরাধসমূহ বিবেচনায় এনে থাকে।

টরন্টোতে অপরাধের যে মাত্রা বিদ্যমান সেটি তুলনা করে দেখা যায়, কানাডার অন্যান্য শহরের চেয়ে টরন্টো ভাল অবস্থানে আছে গত প্রায় একদশক ধরেই।

কানাডায় সার্বিকভাবে গুরুতর অপরাধের মাত্রা মূলত গত আট বছর ধরেই ক্রমশ কমে আসছে। আর সাচকাচুনের সাচকাটুন শহরে সবচেয়ে বেশী অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে।

আর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যে ইমিগ্রেন্টরা বলছেন তারা কম নিরাপদ বোধ করেন, সেই ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই নাকি কানাডায় অপরাধের মাত্রা গত প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে কম অবস্থায় বিরাজ করছে।  ইতিপূর্বে স্যাটিসটিকস কানাডার তথ্যেই বলা হয়েছে টরন্টো মন্ট্রিয়ল প্রভৃতি বড় বড় শহরে সাম্প্রতিককালে আসা ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভয়ঙ্করসব অপরাধের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। এই ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রকৃতপক্ষে একধরণের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করেছে অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রন লেভি বলেন, ইমিগ্রেন্টদের সম্পর্কে আগের দিনে যে একপেশে ভাবনা ছিল, অর্থাৎ ইমিগ্রেন্টরাই সব নষ্টের মূল, সে ভাবনা থেকে আমরা মুক্তি পাবার পথ খুঁজে পেয়েছি। এটি সত্যি উৎসাহব্যঞ্জক একটি ব্যাপার।

স্ট্যাটিসটিসক কানাডার পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইমিগ্রেন্টদের মধ্যে অপরাধের শিকার হওয়ার মাত্রা কম হলেও সাধারণভাবে তারা কম নিরাপদ বোধ করেন। আর আরব দেশসমূহের এবং সেই সাথে আফগানিস্তান ও ইরাকের মহিলাগণ নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন বেশী মাত্রায়। এর কারণ হিসাবে মুসলিম বিদ্বেষের মাত্রা বৃদ্ধিকেই প্রধানত দায়ী করা যায়।

মন্তব্য